নতুন ব্যবসা শুরু করতে এনজিও ঋণ নেওয়ার উপায়

নতুন ব্যবসা এনজিও ঋণ.png

নতুন ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা থাকলেও অনেক উদ্যোক্তার প্রথম চ্যালেঞ্জ হয় প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহ করা। নিজের সঞ্চয় পর্যাপ্ত না হলে ব্যাংক ঋণ, পরিবার বা পরিচিতজনের সহায়তা এবং ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নসহ বিভিন্ন উৎস বিবেচনা করা যায়। তবে একেবারে নতুন ও ছোট পরিসরের ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, জামানত বা পূর্বের ব্যবসায়িক ইতিহাস না থাকায় প্রচলিত ব্যাংক ঋণের শর্ত পূরণ করা কিছু উদ্যোক্তার জন্য কঠিন হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নিজের পরিশোধ সক্ষমতা ও ঋণের শর্ত যাচাই করে অনুমোদিত এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসাভিত্তিক ঋণ বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে শুধু ঋণ পাওয়া যাচ্ছে বলেই ঋণ নেওয়া উচিত নয়। নতুন ব্যবসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ব্যবসা থেকে কিস্তি দেওয়ার মতো নিয়মিত নগদ আয় তৈরি হবে কি না। তাই ঋণের আবেদন করার আগে ব্যবসার সম্ভাব্য বিক্রি, খরচ, লাভ, কিস্তির পরিমাণ এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য হাতে রাখা অর্থ হিসাব করা প্রয়োজন। এই প্রস্তুতি ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ানোর পাশাপাশি ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সাহায্য করে।

বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম তদারক করে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটি বা এমআরএ। সংস্থাটি সনদপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের তথ্যের পাশাপাশি সনদ বাতিল হওয়া প্রতিষ্ঠানের তথ্যও প্রকাশ করে। তাই নতুন ব্যবসার জন্য কোনো ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার আগে এমআরএর সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন ব্যবসার জন্য এনজিও ঋণ কীভাবে কাজে আসে?

এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসাভিত্তিক ঋণ সাধারণত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, স্বনিয়োজিত ব্যক্তি এবং আয়বর্ধক কার্যক্রম পরিচালনা করতে আগ্রহীদের অর্থায়নে ব্যবহৃত হয়। ছোট দোকান, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ, গবাদিপশু পালন, পোশাক তৈরি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, ছোট উৎপাদন কার্যক্রম অথবা স্থানীয় সেবাভিত্তিক ব্যবসার মতো উদ্যোগে এ ধরনের অর্থায়ন ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে কোন খাতে অর্থ দেওয়া হবে এবং সর্বোচ্চ কত টাকা পাওয়া যাবে তা প্রতিষ্ঠান ও ঋণ কর্মসূচিভেদে পরিবর্তিত হয়।

উদাহরণ হিসেবে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন বা পিকেএসএফের অগ্রসর কর্মসূচি ক্ষুদ্র উদ্যোগ উন্নয়নে অর্থায়ন সহায়তা দিয়ে থাকে। পিকেএসএফের প্রকাশিত কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত যোগ্যতার আওতায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ সুবিধা রয়েছে এবং অর্থায়নের পরিমাণ কর্মসূচির শর্ত ও উদ্যোক্তার যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে। পিকেএসএফ সাধারণত অংশীদার সংস্থার মাধ্যমে এই অর্থায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট অংশীদার সংস্থা থেকে বর্তমান ঋণসীমা ও যোগ্যতার শর্ত যাচাই করা উচিত।

ঋণ নেওয়ার আগে ব্যবসার মূলধনের প্রয়োজন হিসাব করুন

নতুন উদ্যোক্তাদের একটি সাধারণ ভুল হলো ব্যবসার প্রকৃত প্রয়োজনের পরিবর্তে যত বেশি সম্ভব ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করা। এর পরিবর্তে প্রথমে একটি সাধারণ মূলধন পরিকল্পনা তৈরি করুন। দোকান বা জায়গার অগ্রিম, পণ্য কেনা, যন্ত্রপাতি, পরিবহন, লাইসেন্স বা প্রয়োজনীয় অনুমতি, প্রাথমিক প্রচার এবং অন্তত কয়েক সপ্তাহের পরিচালন ব্যয় আলাদা করে হিসাব করুন। এরপর নিজের সঞ্চয় বাদ দিয়ে যে ঘাটতি থাকবে, সেই পরিমাণ অর্থের কাছাকাছি ঋণ নেওয়া তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত।

ধরা যাক, ব্যবসা শুরু করতে মোট ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রয়োজন এবং আপনার নিজের কাছে ৬০ হাজার টাকা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে পুরো ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে বাকি ৯০ হাজার টাকার অর্থায়ন কীভাবে করা যায় তা বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে অপ্রয়োজনীয় ঋণের বোঝা কমে এবং ব্যবসার আয় থেকে কিস্তি পরিচালনা সহজ হতে পারে।

এনজিও ঋণের জন্য সাধারণত কী কী যোগ্যতা প্রয়োজন?

যোগ্যতার শর্ত সব প্রতিষ্ঠানে এক নয়। আবেদনকারীর বয়স, বসবাসের এলাকা, আয়ের উৎস, ব্যবসার ধরন, ঋণের উদ্দেশ্য, পূর্বের ঋণের ইতিহাস এবং পরিশোধ সক্ষমতা বিবেচনা করা হতে পারে। কিছু কর্মসূচিতে দল বা সমিতির সদস্য হওয়া প্রয়োজন হতে পারে, আবার ক্ষুদ্র উদ্যোগের তুলনামূলক বড় ঋণে ব্যবসা পরিদর্শন এবং অতিরিক্ত তথ্য চাওয়া হতে পারে।

নতুন ব্যবসা এখনো চালু না হলেও কী ব্যবসা করবেন, কোথায় পরিচালনা করবেন, সম্ভাব্য ক্রেতা কারা এবং কীভাবে আয় তৈরি হবে সে বিষয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। আবেদনের সময় ব্যবসার ধরন, নিজের বিনিয়োগ, প্রত্যাশিত বিক্রি এবং আনুমানিক পরিচালন ব্যয়ের তথ্য যথাসম্ভব সঠিকভাবে উপস্থাপন করুন। সম্ভাব্য বিক্রি বা আয়কে নিশ্চিত আয় হিসেবে না দেখিয়ে বাস্তবসম্মত অনুমানের ভিত্তিতে হিসাব করা ভালো।

এনজিও ঋণের আবেদনে কী কী কাগজপত্র লাগতে পারে?

প্রতিষ্ঠান ও ঋণের ধরনের ওপর নির্ভর করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আলাদা হতে পারে। সাধারণভাবে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, ছবি, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানার তথ্য, মোবাইল নম্বর এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবারের সদস্য বা মনোনীত ব্যক্তির তথ্য চাওয়া হতে পারে। ব্যবসা আগে থেকে চালু থাকলে ব্যবসার ঠিকানা, ট্রেড লাইসেন্স, বিক্রির তথ্য বা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথিও প্রয়োজন হতে পারে।

তাই অনলাইনে পাওয়া কোনো সাধারণ তালিকাকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া উচিত নয়। যে শাখায় আবেদন করবেন, সেখান থেকে বর্তমান কাগজপত্রের তালিকা জেনে নেওয়া ভালো। এতে অপ্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহের ঝামেলা কমবে এবং আবেদন অসম্পূর্ণ থাকার সম্ভাবনাও কমবে।

নতুন ব্যবসার জন্য এনজিও ঋণ নেওয়ার ধাপ

প্রথমে নিজের এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনাকারী কয়েকটি বৈধ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করুন এবং সম্ভব হলে এমআরএর তথ্যের সঙ্গে তাদের সনদ মিলিয়ে নিন। এরপর ব্যবসা বা আয়বর্ধক কার্যক্রমের জন্য প্রযোজ্য ঋণ কর্মসূচির বর্তমান শর্ত জেনে নিন। ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি মেয়াদ, কিস্তির সময়সূচি, সার্ভিস চার্জ, অন্যান্য প্রযোজ্য খরচ এবং সব মিলিয়ে কত টাকা পরিশোধ করতে হবে সে বিষয়ে পরিষ্কার ও সম্ভব হলে লিখিত তথ্য সংগ্রহ করুন।

পছন্দের কর্মসূচি নির্ধারণ করার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করতে হবে। এরপর প্রতিষ্ঠান আবেদনকারীর পরিচয়, ঠিকানা, ব্যবসার পরিকল্পনা এবং পরিশোধ সক্ষমতা যাচাই করতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিনিধি বাড়ি বা ব্যবসার স্থান পরিদর্শন করতে পারেন। যাচাই ও প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর যোগ্য আবেদনকারী ঋণ পেতে পারেন। প্রক্রিয়া, সময় এবং অনুমোদনের শর্ত প্রতিষ্ঠানভেদে আলাদা হওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ের নিশ্চয়তা ধরে পরিকল্পনা করা ঠিক নয়।

ঋণদাতা এনজিও বৈধ কি না যেভাবে যাচাই করবেন

ঋণ নেওয়ার আগে এমআরএর ওয়েবসাইটে সনদপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের তালিকা দেখা যেতে পারে। এমআরএর আলাদা ই-ভেরিফিকেশন ব্যবস্থায় লাইসেন্স নম্বর দিয়েও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সনদ যাচাইয়ের সুবিধা রয়েছে। একই সঙ্গে সনদ বাতিল হওয়া প্রতিষ্ঠানের তালিকাও এমআরএ প্রকাশ করে। ফলে শুধু পরিচিত নাম, স্থানীয় অফিস বা কোনো প্রতিনিধির কথার ওপর নির্ভর না করে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া নিরাপদ।

সার্ভিস চার্জ ও মোট কিস্তি ভালোভাবে বুঝুন

ঋণের ক্ষেত্রে শুধু হাতে কত টাকা পাওয়া যাবে সেটি বিবেচনা করলেই হবে না। সার্ভিস চার্জ কোন পদ্ধতিতে হিসাব করা হচ্ছে এবং মেয়াদ শেষে সব মিলিয়ে কত টাকা পরিশোধ করতে হবে সেটিও বুঝতে হবে। ক্ষুদ্রঋণের সার্ভিস চার্জ ও সংশ্লিষ্ট নিয়ম নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং এসব নিয়ম সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার সময় এমআরএর সর্বশেষ নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ঋণপত্র বা লিখিত শর্ত যাচাই করুন।

নির্দিষ্ট কোনো হার সব ধরনের ঋণ বা কর্মসূচিতে একইভাবে প্রযোজ্য ধরে নেওয়া উচিত নয়। আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির বর্তমান সার্ভিস চার্জ, মেয়াদ, কিস্তির সংখ্যা এবং মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ সম্পর্কে লিখিত তথ্য দেখুন। বিশেষ করে হাতে কত টাকা পাওয়া যাবে এবং মেয়াদ শেষে সব মিলিয়ে কত টাকা পরিশোধ করতে হবে, এই দুটি তথ্য পরিষ্কারভাবে বুঝে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

কিস্তি দেওয়ার সক্ষমতা কীভাবে যাচাই করবেন?

এখানে একটি ব্যবহারিক “কিস্তি সক্ষমতা পরীক্ষা” কাজে আসতে পারে। ব্যবসার প্রত্যাশিত বিক্রিকে লাভ ধরে নেবেন না। প্রথমে বিক্রি থেকে পণ্য কেনার খরচ, দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ, পরিবহন, কর্মচারী এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বাদ দিন। এরপর যে প্রকৃত নগদ উদ্বৃত্ত থাকে, সেখান থেকে কিস্তি দেওয়া সম্ভব কি না দেখুন।

বিশেষ করে নতুন ব্যবসার প্রথম মাস থেকেই সর্বোচ্চ বিক্রি হবে এমন ধারণার ওপর ঋণের পরিকল্পনা করা ঝুঁকিপূর্ণ। বিক্রি প্রত্যাশার চেয়ে কম হলেও যেন কিস্তি চালানো যায়, সেই হিসাব আগে করা ভালো। ব্যবসার টাকা এবং পরিবারের দৈনন্দিন খরচের টাকা আলাদা রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে ব্যবসা আসলে লাভ করছে কি না সহজে বোঝা যায়।

পিকেএসএফের ক্ষুদ্র উদ্যোগ অর্থায়ন কেন বিবেচনায় রাখা যায়?

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র উদ্যোগ অর্থায়নে পিকেএসএফ বিভিন্ন অংশীদার সংস্থার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করে। এর ক্ষুদ্র উদ্যোগভিত্তিক কর্মসূচিগুলো উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের একটি সম্ভাব্য উৎস হতে পারে। তবে কর্মসূচির ঋণসীমা, যোগ্যতা, অংশীদার সংস্থা এবং অন্যান্য শর্ত পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে পিকেএসএফ ও সংশ্লিষ্ট অংশীদার সংস্থার সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য যাচাই করা উচিত।

ঋণ নেওয়ার আগে যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন

ব্যবসার প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ঋণ নেওয়া, পুরোনো ঋণের কিস্তি দিতে নতুন ঋণ নেওয়া, ব্যবসার টাকা ব্যক্তিগত খরচে ব্যবহার করা এবং কিস্তির হিসাব না করে আবেদন করা এড়িয়ে চলা উচিত। একইভাবে কোনো মধ্যস্থতাকারীকে যাচাই ছাড়া টাকা দেওয়া বা দ্রুত ঋণ পাইয়ে দেওয়ার মৌখিক আশ্বাসে অর্থ প্রদান করাও নিরাপদ নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ঋণকে ব্যবসার আয় হিসেবে না দেখা। ঋণ একটি ফেরতযোগ্য অর্থায়ন। এটি তখনই কার্যকর যখন সেই অর্থ এমন কাজে ব্যবহার করা হয় যেখান থেকে ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত নগদ প্রবাহ তৈরি হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।

  • তথ্য যাচাইয়ের পরামর্শ: ক্ষুদ্রঋণের কর্মসূচি, ঋণসীমা, সার্ভিস চার্জ, যোগ্যতা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই এই লেখার তথ্যকে প্রাথমিক নির্দেশনা হিসেবে ব্যবহার করে আবেদন করার আগে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটি (MRA) এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য ও লিখিত ঋণশর্ত যাচাই করুন।

নতুন ব্যবসার জন্য এনজিও ঋণ সম্পর্কে ১০টি প্রশ্ন ও উত্তর

১. নতুন ব্যবসা শুরু করার আগেই কি এনজিও ঋণ পাওয়া সম্ভব?

কিছু ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি আয়বর্ধক কার্যক্রম বা নতুন উদ্যোগে অর্থায়ন করতে পারে। তবে আবেদন করলেই ঋণ পাওয়া নিশ্চিত নয়। প্রতিষ্ঠান আবেদনকারীর পরিকল্পনা, পরিশোধ সক্ষমতা, বসবাসের এলাকা এবং নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়।

২. ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স না থাকলে কি আবেদন করা যায়?

এটি ঋণের ধরন ও প্রতিষ্ঠানের শর্তের ওপর নির্ভর করে। অতি ক্ষুদ্র আয়বর্ধক কার্যক্রম এবং তুলনামূলক বড় ব্যবসায়িক ঋণের কাগজপত্র এক নয়। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে বর্তমান নথির তালিকা জেনে নেওয়া উচিত।

৩. এনজিও থেকে ব্যবসার জন্য কত টাকা ঋণ পাওয়া যায়?

একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। ঋণের কর্মসূচি, ব্যবসার আকার, আবেদনকারীর সক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরিমাণ নির্ধারিত হয়। পিকেএসএফের অগ্রসর কর্মসূচিতে যোগ্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের সুযোগের কথা উল্লেখ রয়েছে।

৪. ঋণের আবেদন করতে কি জামানত প্রয়োজন হয়?

ক্ষুদ্রঋণের বিভিন্ন কর্মসূচিতে জামানতের ধরন প্রচলিত ব্যাংক ঋণের তুলনায় ভিন্ন হতে পারে। তবে সব ঋণকে জামানতবিহীন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ঋণের পরিমাণ ও কর্মসূচি অনুযায়ী গ্যারান্টর, ব্যবসার তথ্য বা অন্য ধরনের নিশ্চয়তা চাওয়া হতে পারে।

৫. ঋণ পাওয়ার আগে কোনো টাকা দিতে হয় কি?

আবেদন বা ঋণ প্রক্রিয়ায় কোনো ফি বা অন্য খরচ প্রযোজ্য হলে সেটি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত কি না এবং তার লিখিত বিবরণ আছে কি না যাচাই করুন। অর্থ পরিশোধ করলে অফিসিয়াল রসিদ সংগ্রহ করুন। কোনো ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে অর্থ চেয়ে নিশ্চিত বা দ্রুত ঋণ অনুমোদনের প্রতিশ্রুতি দিলে অর্থ দেওয়ার আগে সরাসরি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসে তথ্য যাচাই করা উচিত।

৬. কোন এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া ভালো?

একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সবার জন্য সেরা বলা যায় না। প্রথমে প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা এবং আপনার এলাকায় কার্যক্রম রয়েছে কি না যাচাই করুন। এরপর ব্যবসার জন্য প্রযোজ্য ঋণের শর্ত, সার্ভিস চার্জ, কিস্তির সময়সূচি, মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তুলনা করুন। নিজের ব্যবসার নগদ প্রবাহ ও পরিশোধ সক্ষমতার সঙ্গে যে কর্মসূচির শর্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটি বিবেচনা করা বেশি যুক্তিসংগত।

৭. সাপ্তাহিক নাকি মাসিক কিস্তি নতুন ব্যবসার জন্য সুবিধাজনক?

এটি ব্যবসার নগদ প্রবাহ ও সংশ্লিষ্ট ঋণ কর্মসূচির শর্তের ওপর নির্ভর করে। কোনো ব্যবসায় নিয়মিত নগদ আয় হতে পারে, আবার কোনো ব্যবসায় আয় পেতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগে। তাই সাপ্তাহিক বা মাসিক কোন সময়সূচি ভালো তা সাধারণভাবে নির্ধারণ না করে ব্যবসার আয়চক্রের সঙ্গে কিস্তির সময়সূচি সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না যাচাই করা উচিত।

৮. একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে একসঙ্গে ঋণ নেওয়া কি ঠিক?

একাধিক ঋণ থাকলে মোট কিস্তির চাপ দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। নতুন ব্যবসার আয় এখনো স্থিতিশীল না হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। তাই নতুন ঋণ নেওয়ার আগে বর্তমানে থাকা সব ঋণের কিস্তি যোগ করে মোট মাসিক দায় হিসাব করা উচিত।

৯. ঋণের টাকা পাওয়ার পর প্রথমে কোথায় ব্যবহার করা উচিত?

ঋণের অর্থ অনুমোদিত ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য এবং ঋণচুক্তির শর্ত অনুযায়ী ব্যবহার করা উচিত। ব্যবসার পরিকল্পনায় প্রয়োজনীয় পণ্য, যন্ত্রপাতি বা কার্যকর মূলধনের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ ব্যক্তিগত বা পরিকল্পনার বাইরের ব্যয়ে ব্যবহার করলে ব্যবসার নগদ প্রবাহ ও কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

১০. ব্যবসা শুরু করতে এনজিও ঋণ নেওয়া কি ভালো সিদ্ধান্ত?

ব্যবসার বাস্তব চাহিদা, বাজার সম্পর্কে ধারণা এবং কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা থাকলে ক্ষুদ্রঋণ প্রয়োজনীয় মূলধনের একটি উৎস হতে পারে। কিন্তু শুধু অর্থ পাওয়া যাচ্ছে বলে ঋণ নেওয়া ভালো সিদ্ধান্ত নয়। প্রত্যাশিত বিক্রি কমে গেলেও কিস্তি দেওয়া সম্ভব কি না যাচাই করার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া বেশি দায়িত্বশীল।

উপসংহার

নতুন ব্যবসা শুরু করতে এনজিও ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম কাজ হওয়া উচিত ব্যবসার প্রকৃত মূলধনের প্রয়োজন নির্ধারণ করা। এরপর এমআরএ অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান যাচাই, কয়েকটি ঋণ কর্মসূচির শর্ত তুলনা, মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ বোঝা এবং নিজের কিস্তি সক্ষমতা হিসাব করা প্রয়োজন।

ঋণ ব্যবসার সমস্যার স্বয়ংক্রিয় সমাধান নয়; সঠিক পরিকল্পনায় ব্যবহার করলে এটি প্রয়োজনীয় মূলধনের ঘাটতি পূরণের একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে হিসাব করুন, শর্ত পড়ুন এবং এমন পরিমাণ ঋণ নিন যার কিস্তি ব্যবসার বাস্তব নগদ প্রবাহ থেকে পরিচালনা করা সম্ভব।

দায়মুক্তি: এই লেখাটি সাধারণ তথ্য ও সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি। এটি কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার সুপারিশ, ঋণ অনুমোদনের নিশ্চয়তা বা ব্যক্তিগত আর্থিক পরামর্শ নয়। ঋণ নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বর্তমান শর্ত, মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ এবং নিজের পরিশোধ সক্ষমতা যাচাই করুন।