ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য কম সুদে লোন দেয় এমন এনজিও

ক্ষুদ্র ব্যবসা লোন.png

ছোট একটি দোকান বড় করা, নতুন পণ্য কেনা, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ শুরু করা কিংবা চলতি ব্যবসার মূলধনের ঘাটতি পূরণ করতে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ব্যাংক থেকে ব্যবসায়িক ঋণ নিতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, জামানত বা ব্যবসার আর্থিক রেকর্ড না থাকায় অনেকের জন্য সেই অর্থ সংগ্রহ করা সহজ হয় না। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ দিয়ে থাকে।

তবে ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য কম সুদে লোন দেয় এমন এনজিও খুঁজতে গিয়ে শুধু বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা ঋণের পরিমাণ বা কিস্তির সুবিধা দেখলে চলবে না। সার্ভিস চার্জ কত, সেটি কীভাবে হিসাব করা হচ্ছে, কত দিনে কিস্তি দিতে হবে, বাধ্যতামূলক সঞ্চয় আছে কি না এবং ঋণের পুরো মেয়াদে নিজের পকেট থেকে মোট কত টাকা যাবে, এসব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটি বা এমআরএ-এর নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হয়। ঋণের খরচ মূল্যায়নের সময় শুধু প্রচারিত সার্ভিস চার্জ না দেখে সেটি কোন পদ্ধতিতে হিসাব করা হচ্ছে, মোট কত টাকা পরিশোধ করতে হবে এবং কিস্তির সময়সূচি ব্যবসার নগদ প্রবাহের সঙ্গে মানানসই কি না যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট হার ও শর্ত পরিবর্তিত হতে পারে, তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বর্তমান লিখিত ঋণসূচি যাচাই করা উচিত।

ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য এনজিও লোন কী?

এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক ঋণ মূলত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয়বর্ধক কাজে অর্থায়নের জন্য দেওয়া হয়। মুদি দোকান, কাপড়ের ব্যবসা, সেলাই, ক্ষুদ্র উৎপাদন, কৃষি, গবাদিপশু পালন, মৎস্য চাষ, খাবারের ব্যবসা এবং বিভিন্ন সেবামূলক উদ্যোগে এ ধরনের অর্থ ব্যবহার করা যায়। প্রচলিত ব্যাংক ঋণের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে জামানতের শর্ত সহজ হওয়ায় ছোট উদ্যোক্তাদের কাছে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কম সুদের এনজিও লোন বলতে কী বোঝায়?

এনজিও ঋণের খরচ বোঝার সময় “সুদ” এবং “সার্ভিস চার্জ” শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত তাদের ঋণের খরচ সার্ভিস চার্জ হিসেবে উল্লেখ করে এবং হিসাবের পদ্ধতি ঋণের শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত হতে পারে। তাই কোনো একটি শতাংশ দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বর্তমান সার্ভিস চার্জ, হিসাবের পদ্ধতি, কিস্তির সংখ্যা এবং মোট ফেরতযোগ্য অর্থ লিখিতভাবে জেনে নেওয়া ভালো।

কোনো ঋণ আপনার ব্যবসার জন্য তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী কি না বুঝতে হাতে প্রকৃত কত টাকা পাবেন, পুরো মেয়াদে মোট কত টাকা পরিশোধ করবেন এবং নিয়মিত কিস্তি বা বাধ্যতামূলক সঞ্চয়ের পরিমাণ কত—এই তথ্যগুলো পাশাপাশি তুলনা করুন। এতে শুধু ঘোষিত হারের পরিবর্তে ঋণের বাস্তব খরচ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সহজ হয়।

কোনো প্রতিষ্ঠানের ঋণ সত্যিই আপনার জন্য কম খরচের কি না বুঝতে তাই তিনটি সংখ্যা জানতে হবে: হাতে প্রকৃত কত টাকা পাবেন, পুরো মেয়াদে মোট কত টাকা ফেরত দেবেন এবং বাধ্যতামূলক সঞ্চয়সহ নিয়মিত কত টাকা জমা দিতে হবে। মাঠপর্যায়ে ঋণ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এই তিনটি হিসাব পাশাপাশি লিখে তুলনা করা শুধু ঘোষিত শতাংশ তুলনা করার চেয়ে বেশি কার্যকর।

ব্যুরো বাংলাদেশ

ব্যুরো বাংলাদেশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও আয়বর্ধক কার্যক্রমের জন্য বিভিন্ন ধরনের ঋণসেবা পরিচালনা করে। ব্যবসার ধরন, অর্থের প্রয়োজন, আবেদনকারীর যোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির ভিত্তিতে ঋণের পরিমাণ, মেয়াদ ও পরিশোধের শর্ত আলাদা হতে পারে।

প্রতিষ্ঠানটির কিছু ঋণ কর্মসূচিতে ব্যবসার কার্যকর মূলধনের প্রয়োজনও গ্রহণযোগ্য উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট কর্মসূচির ঋণসীমা বা সার্ভিস চার্জ সব আবেদনকারীর জন্য প্রযোজ্য ধরে নেওয়া উচিত নয়। আবেদন করার আগে নিকটস্থ অনুমোদিত শাখা বা প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল তথ্যসূত্র থেকে বর্তমান ঋণসীমা, সার্ভিস চার্জ, মেয়াদ, কিস্তি এবং যোগ্যতার শর্ত যাচাই করুন।

জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন

জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন ক্ষুদ্রঋণের পাশাপাশি বিভিন্ন আয়বর্ধক ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন আর্থিক অবস্থার মানুষের জন্য প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মসূচি রয়েছে।

তবে প্রতিটি কর্মসূচির উদ্দেশ্য ও যোগ্যতা এক নয়। কোনো কর্মসূচিতে তুলনামূলক কম সার্ভিস চার্জ বা সুবিধাজনক পরিশোধের ব্যবস্থা থাকলেও সেটি সব ব্যবসায়ী বা আবেদনকারীর জন্য প্রযোজ্য নাও হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির বর্তমান ঋণসীমা, সার্ভিস চার্জ, কিস্তির ধরন এবং যোগ্যতার শর্ত অফিসিয়াল উৎস বা স্থানীয় শাখা থেকে যাচাই করুন।

সাজিদা ফাউন্ডেশন

সাজিদা ফাউন্ডেশনের ক্ষুদ্র অর্থায়ন কার্যক্রমে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোক্তা ও আয়বর্ধক কাজের জন্য ঋণসেবা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কিছু কর্মসূচিতে জামানতবিহীন অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে এবং নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী ও ব্যবসার প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা ঋণ কর্মসূচি পরিচালিত হতে পারে।

ঋণের সীমা, সার্ভিস চার্জ এবং পরিশোধের শর্ত কর্মসূচি ও সময় অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। তাই পুরোনো প্রতিবেদন বা ওয়েবপেজে উল্লেখ করা হারকে বর্তমান হার ধরে না নিয়ে আবেদন করার সময় প্রতিষ্ঠানটির অফিসিয়াল তথ্য বা অনুমোদিত শাখা থেকে লিখিত ঋণসূচি সংগ্রহ করুন।

ব্র্যাকের ক্ষুদ্র উদ্যোগ ঋণ

ব্র্যাকের ক্ষুদ্র অর্থায়ন কার্যক্রমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও আয়বর্ধক উদ্যোগের জন্য বিভিন্ন অর্থায়ন সুবিধা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ক্ষুদ্র উদ্যোগভিত্তিক কর্মসূচিগুলো ব্যবসার কার্যকর মূলধন বা সম্প্রসারণের প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করতে পারে। তবে ঋণের পরিমাণ, যোগ্যতা, সার্ভিস চার্জ এবং পরিশোধের শর্ত আবেদনকারী ও কর্মসূচি অনুযায়ী আলাদা হতে পারে।

ব্র্যাকের ক্ষেত্রে বর্তমান আবেদনকারীর জন্য প্রযোজ্য নির্দিষ্ট সার্ভিস চার্জ, ঋণের সীমা ও পরিশোধসূচি আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে লিখিতভাবে নেওয়া উচিত। পুরোনো ওয়েবসাইট বা পুরোনো প্রতিবেদন থেকে পাওয়া হারকে বর্তমান হার ধরে ব্যবসার হিসাব তৈরি করা নিরাপদ নয়।

পিকেএসএফের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ঋণ

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন বা পিকেএসএফ সরাসরি সাধারণ গ্রাহকের কাছে শাখাভিত্তিক এনজিও ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য তাদের অগ্রসর কর্মসূচি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পিকেএসএফের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জমি ও ভবনের মূল্য বাদ দিয়ে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ থাকা ব্যবসা এই কর্মসূচির আওতায় বিবেচিত হতে পারে এবং একজন উদ্যোক্তার ঋণসীমা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা।

পিকেএসএফ বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও আয়বর্ধক কার্যক্রমে অর্থায়ন সহায়তা দিয়ে থাকে। ফলে সরাসরি পিকেএসএফে সাধারণ ঋণের আবেদন করার পরিবর্তে আপনার এলাকায় তাদের কোন সহযোগী প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি পরিচালনা করছে তা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। ঋণের বর্তমান সীমা, যোগ্যতা ও পরিশোধের শর্ত সংশ্লিষ্ট সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে নিশ্চিত করুন।

কোন এনজিওর লোন আপনার জন্য ভালো হতে পারে?

সবার জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে সবচেয়ে ভালো বলা বাস্তবসম্মত নয়। ৫০ হাজার টাকার পুঁজির প্রয়োজন থাকা একজন ক্ষুদ্র দোকানদার এবং ৫ লাখ টাকা প্রয়োজন থাকা একটি উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানের চাহিদা এক নয়। একইভাবে প্রতিদিন আয় হয় এমন দোকান সাপ্তাহিক কিস্তি সামলাতে পারলেও মৌসুমি কৃষি ব্যবসার জন্য সেই কিস্তি অসুবিধাজনক হতে পারে।

তাই প্রতিষ্ঠানের নামের আগে নিজের ব্যবসার নগদ প্রবাহ বিবেচনা করুন। কিস্তির পরিমাণ এমন হওয়া প্রয়োজন যাতে নিয়মিত পরিশোধের পরও পণ্য কেনা, দোকান ভাড়া, পরিবহন, জরুরি ব্যবসায়িক ব্যয় এবং প্রয়োজনীয় পারিবারিক খরচ পরিচালনার মতো পর্যাপ্ত অর্থ থাকে। ঋণ নেওয়ার আগে কয়েক মাসের আয় ও ব্যয়ের হিসাব দেখে বাস্তবে কত কিস্তি বহন করা সম্ভব তা নির্ধারণ করা ভালো।

লোন নেওয়ার আগে যে হিসাবটি অবশ্যই করবেন

ধরা যাক, ব্যবসার জন্য আপনার ১ লাখ টাকা প্রয়োজন। একটি প্রতিষ্ঠান কত শতাংশ সার্ভিস চার্জ বলছে শুধু সেটি লিখবেন না। তাদের কাছে জানতে চান, “১ লাখ টাকা নিলে আমার হাতে ঠিক কত টাকা দেওয়া হবে এবং সব কিস্তি মিলিয়ে মোট কত টাকা দিতে হবে?” এরপর কিস্তির সংখ্যা ও প্রতিটি কিস্তির পরিমাণ লিখে নিন। অন্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই হিসাব সংগ্রহ করুন।

এই পদ্ধতিতে তুলনা করলে সদস্য ফি, বাধ্যতামূলক সঞ্চয় বা অন্য কোনো প্রযোজ্য খরচ থাকলে সেগুলোও সহজে শনাক্ত করা যায়। ঋণের মূল টাকা ও সার্ভিস চার্জের বাইরে কোনো অর্থ দিতে হলে সেটি কী বাবদ নেওয়া হচ্ছে তা জেনে নিন এবং প্রয়োজনীয় রসিদ সংগ্রহ করুন। কোনো চার্জ নিয়ে সন্দেহ থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত শাখা বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত।

  • তথ্য যাচাইয়ের নোট: ঋণের সার্ভিস চার্জ, সীমা, যোগ্যতা ও পরিশোধের নিয়ম সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। এই কারণে আবেদন বা আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এমআরএ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল তথ্য এবং অনুমোদিত শাখা থেকে সর্বশেষ শর্ত যাচাই করুন। এই লেখাটি বিভিন্ন ঋণ বিকল্প বুঝতে সহায়তা করার জন্য; এটি কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার ব্যক্তিগত আর্থিক পরামর্শ নয়।

আবেদনের জন্য কী কী প্রয়োজন হতে পারে?

প্রতিষ্ঠান ও ঋণের ধরন অনুযায়ী নিয়ম আলাদা হলেও সাধারণত জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, বর্তমান ঠিকানার তথ্য, ব্যবসার বিবরণ এবং প্রয়োজনীয় অর্থের উদ্দেশ্য জানতে চাওয়া হতে পারে। বড় অঙ্কের ক্ষুদ্র উদ্যোগ ঋণের ক্ষেত্রে ব্যবসা কতদিন ধরে চলছে, আয়-ব্যয়ের অবস্থা এবং আগের ঋণ পরিশোধের ইতিহাসও দেখা হতে পারে। কোনো কোনো কর্মসূচিতে সদস্য হওয়া বা দলভুক্ত হওয়ার নিয়ম থাকতে পারে।

এমআরএ সনদ যাচাই কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ঋণ নেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানটি বৈধভাবে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে কি না যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। এমআরএ-এর অনলাইন ই-ভেরিফিকেশন ব্যবস্থায় ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সনদ নম্বর দিয়ে তথ্য যাচাই করার সুবিধা রয়েছে। পাসবই বা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডেও সনদ নম্বর আছে কি না দেখা যেতে পারে।

অপরিচিত কোনো ব্যক্তি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ফোনে যোগাযোগ করে আগাম টাকা পাঠাতে বললে সতর্ক থাকুন। প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত শাখায় গিয়ে আবেদন, ঋণের শর্ত এবং টাকা পরিশোধের নিয়ম নিশ্চিত করা তুলনামূলক নিরাপদ পদ্ধতি।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য কোন এনজিও কম সুদে লোন দেয়?

একটি এনজিওকে সব আবেদনকারীর জন্য সবচেয়ে কম খরচের বলা যায় না। সার্ভিস চার্জ, ঋণের পরিমাণ, মেয়াদ, কিস্তির ধরন এবং যোগ্যতা কর্মসূচি অনুযায়ী আলাদা হতে পারে। তাই ব্যুরো বাংলাদেশ, জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন, সাজিদা ফাউন্ডেশন, ব্র্যাক বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বিবেচনা করলে একই পরিমাণ ঋণের জন্য মোট ফেরতযোগ্য অর্থ ও কিস্তির সূচি সংগ্রহ করে তুলনা করুন। আবেদন করার আগে বর্তমান শর্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল উৎস থেকে যাচাই করুন।

২. এনজিও থেকে ব্যবসার জন্য কত টাকা লোন পাওয়া যায়?

ঋণের পরিমাণ প্রতিষ্ঠান, কর্মসূচি, ব্যবসার ধরন এবং আবেদনকারীর পরিশোধ সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। ছোট আয়বর্ধক কার্যক্রমের জন্য তুলনামূলক কম পরিমাণের ঋণ থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠিত ক্ষুদ্র উদ্যোগের জন্য বড় অঙ্কের অর্থায়নও থাকতে পারে। সঠিক ঋণসীমা জানতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বর্তমান কর্মসূচির তথ্য যাচাই করুন।

৩. নতুন ব্যবসা শুরু করার জন্য এনজিও লোন পাওয়া যায়?

কিছু কর্মসূচিতে নতুন আয়বর্ধক উদ্যোগের জন্য অর্থায়নের সুযোগ থাকতে পারে। তবে বড় অঙ্কের ক্ষুদ্র উদ্যোগ ঋণে আগে থেকে ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা চাওয়া হতে পারে। নতুন উদ্যোক্তাকে তাই সংশ্লিষ্ট শাখায় নিজের ব্যবসার পরিকল্পনা, সম্ভাব্য আয় এবং প্রয়োজনীয় পুঁজির পরিষ্কার হিসাব নিয়ে যোগাযোগ করা উচিত।

৪. জামানত ছাড়া ব্যবসায়িক লোন পাওয়া সম্ভব?

কিছু ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিতে প্রচলিত সম্পত্তির জামানত ছাড়াই ঋণ পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। তবে “জামানতবিহীন” মানেই কোনো যোগ্যতা বা যাচাই প্রয়োজন হবে না এমন নয়। প্রতিষ্ঠান ও কর্মসূচি অনুযায়ী সদস্যপদ, দলভুক্তি, ব্যবসা যাচাই, পরিচয়পত্র, পরিশোধ সক্ষমতা বা অন্যান্য শর্ত থাকতে পারে। আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট ঋণের বর্তমান যোগ্যতা ও শর্ত যাচাই করুন।

৫. সাপ্তাহিক নাকি মাসিক কিস্তি ভালো?

এটি ব্যবসার আয়ের ধরনের ওপর নির্ভর করে। প্রতিদিন বিক্রি হয় এমন ব্যবসায় সাপ্তাহিক কিস্তি পরিচালনা সহজ হতে পারে। কিন্তু কৃষি, মৌসুমি পণ্য বা দীর্ঘ উৎপাদনচক্রের ব্যবসায় মাসিক কিংবা ব্যবসার আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিস্তি বেশি সুবিধাজনক হতে পারে।

৬. সার্ভিস চার্জ এবং সুদ কি একই বিষয়?

ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত তাদের ঋণের সঙ্গে সম্পর্কিত খরচকে “সার্ভিস চার্জ” হিসেবে উল্লেখ করে। গ্রাহকের জন্য শুধু নাম বা ঘোষিত শতাংশের পরিবর্তে ঋণের প্রকৃত মোট খরচ বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কত টাকা হাতে পাবেন, কত কিস্তিতে পরিশোধ করবেন এবং মেয়াদ শেষে মোট কত টাকা ফেরত দিতে হবে—এই তথ্যগুলো লিখিতভাবে সংগ্রহ করলে বিভিন্ন ঋণ তুলনা করা সহজ হয়।

৭. ২৪ শতাংশ সার্ভিস চার্জ মানে কি মূল টাকার ওপর সরাসরি ২৪ শতাংশ যোগ হবে?

না। শুধু ঘোষিত সার্ভিস চার্জের হার দেখে মোট কত টাকা পরিশোধ করতে হবে তা সবসময় নির্ভুলভাবে বোঝা যায় না। হিসাবের পদ্ধতি, ঋণের মেয়াদ, কিস্তির সময়সূচি এবং অন্যান্য প্রযোজ্য শর্ত মোট খরচকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই অনুমান করার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে লিখিত কিস্তি সূচি ও মোট ফেরতযোগ্য অর্থের হিসাব সংগ্রহ করুন।

৮. একই সময়ে একাধিক এনজিও থেকে লোন নেওয়া কি ভালো সিদ্ধান্ত?

ব্যবসার আয় যথেষ্ট না হলে এক ঋণের কিস্তি দিতে আরেকটি ঋণ নেওয়া আর্থিক চাপ বাড়াতে পারে। নতুন ঋণ নেওয়ার আগে বর্তমানে থাকা সব কিস্তি, পরিবারের ব্যয় এবং ব্যবসার নিয়মিত খরচ যোগ করে মাসিক নগদ প্রবাহ হিসাব করা উচিত। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ঋণ নেওয়াও এড়িয়ে চলা ভালো।

৯. এনজিও লোন নেওয়ার আগে কীভাবে প্রতিষ্ঠান যাচাই করব?

প্রথমে প্রতিষ্ঠানের এমআরএ সনদ আছে কি না যাচাই করুন। এমআরএ-এর ই-ভেরিফিকেশন ব্যবস্থায় সনদ নম্বর দিয়ে তথ্য পরীক্ষা করা যায়। এরপর স্থানীয় অনুমোদিত শাখায় গিয়ে ঋণের বর্তমান শর্ত, সার্ভিস চার্জ, কিস্তি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে লিখিত তথ্য সংগ্রহ করুন।

১০. ব্যবসার জন্য কত টাকা ঋণ নেওয়া উচিত?

যত টাকা পাওয়া সম্ভব তত টাকা ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে ব্যবসায় বাস্তবে কত অতিরিক্ত মূলধন প্রয়োজন তা আগে হিসাব করুন। সেই অর্থ কোথায় ব্যবহার হবে, সম্ভাব্য নগদ প্রবাহ কত এবং নিয়মিত ব্যবসায়িক খরচের পাশাপাশি কিস্তি বহন করা সম্ভব কি না বিবেচনা করুন। প্রয়োজন হলে ঋণ নেওয়ার আগে নিজের হিসাবরক্ষক বা উপযুক্ত আর্থিক পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

উপসংহার

ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য এনজিও ঋণ বাছাইয়ের সময় শুধু প্রতিষ্ঠানের নাম বা প্রচারিত সার্ভিস চার্জের ওপর নির্ভর না করে ঋণের মোট খরচ, কিস্তির সময়সূচি, মেয়াদ এবং যোগ্যতার শর্ত একসঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা অর্থায়ন কর্মসূচি থাকায় একই ঋণ সবার জন্য সমানভাবে উপযোগী নাও হতে পারে।

আবেদন করার আগে দুই বা তিনটি প্রতিষ্ঠানের বর্তমান লিখিত শর্ত সংগ্রহ করে তুলনা করুন। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের এমআরএ সনদ যাচাই করুন এবং নিজের ব্যবসার বাস্তব আয় ও ব্যয়ের ভিত্তিতে কিস্তি বহনের সক্ষমতা হিসাব করুন। এতে প্রয়োজন ও সামর্থ্যের সঙ্গে মানানসই ঋণ বেছে নেওয়া সহজ হবে।