ফজরের নামাজ কয় রাকাত, ফজরের নামাজ কিভাবে পড়তে হয়?

ফজরের নামাজ কয় রাকাত

ফজরের নামাজ কয় রাকাত ও কি কি এবং ফজরের নামাজের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি কেন? ফজরের নামাজ কিভাবে পড়তে হয়, ফজরের নামাজ সম্পর্কিত হাদিস, ফজরের নামাজের ওয়াক্ত কখন শুরু হয় এবং ফজরের নামাজ কয়টা পর্যন্ত পড়া যায়, এসকল প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন আজকের এই পোস্টিতে। ফজরের নামাজের ফাজায়েল সম্পর্কিত হাদিস সমূহ রেফারেন্স সহ তুলে ধরবো ইনশাআল্লাহ। আশা করি পোস্টের মাধ্যমে ফজর নামাজ সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারবেন। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে ফজর নামাজ সবার আগে আসে এবং দিনের শুরুটা হয় এই নামাজ দিয়ে।

ফজরের নামাজ সম্পর্কিত হাদিস

হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নফল (ও সুন্নাতের)এর মধ্যে কোন নামাজের এত গুরুত্ব ছিল না যত ফজরের পূর্বে দুই রাকাত সুন্নাত পড়ার গুরুত্ব ছিল। (মুসলিম)

হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত সম্পর্কে এরশাদ করেছেন যে, এই দুই রাকাত আমার নিকট সমগ্র দুনিয়া হতে প্রিয়। (মুসলিম)

হযরত মুআয ইবনে আনাস জুহানী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ শেষ করে উক্ত জায়গায় বসে থাকে, ভাল কথা ছাড়া কোন কথা না বলে। অতঃপর দুই রাকাত এশরাকের নামাজ পড়ে তার গুনাহ মাফ হয়ে যায়, যদিও তা সমুদ্রের ফেনা হতে অধিক হয়। (আবু দাউদ)

হযরত আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আল্লাহ তায়ালা যখন বান্দাদের ফয়সালা হতে অবসর হবেন এবং এই এরাদা করবেন যে, আপন মর্জি অনুসারে যাকে ইচ্ছা দোযখ হতে বের করে নিবেন তখন ফেরেশতাদেরকে হুকুম করবেন যে, যারা দুনিয়াতে শির্ক করে নাই এবং লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছে, তাদেরকে দোযখের আগুন হতে বের করে লও। ফেরেশতারা তাদেরকে সেজদার চিহ্নের কারণে চিনতে পারবেন। আগুন সেজদার চিহ্নগুলো ব্যতীত সমস্ত শরীরকে জ্বালিয়ে দিবে। কারণ আল্লাহ তায়ালা দোযখের আগুনের উপর সেজদার চিহ্নসগুলোকে জ্বালানো হারাম করে দিয়েছেন। এই সমস্ত লোকদেরকে (যাদের সম্পর্কে ফেরেশতাদেরকে হুকুম দেওয়া হয়েছিল) জাহান্নামের আগুন হতে বের করে নেয়া হবে। (মুসলিম)

ব্যাখ্যা : সেজদার চিহ্নসমূহ দ্বারা উদ্দেশ্য সেই সপ্ত অঙ্গ যার উপর মানুষ সেজদা করে-কপাল, উভয় হাত, উভয় হাঁটু ও উভয় পা। (নাবাবী)

হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই কথা বলতে শুনেছি যে, মানুষ নামাজ শেষ করার পর তার জন্য সওয়াবের দশ ভাগের এক ভাগ লেখা হয়, এমনভাবে কারো জন্য নয় ভাগের এক ভাগ, আট ভাগের এক ভাগ, সাত ভাগের এক ভাগ, ছয় ভাগের এক ভাগ, পাঁচ ভাগের এক ভাগ, চার ভাগের এক ভাগ, তিন ভাগের এক ভাগ, অর্ধেক অংশ লেখা হয়। (আবু দাউদ)

ব্যাখ্যা : হাদীস শরীফের উদ্দেশ্য এই যে, নামাজের বাহ্যিক বিষয় ও অভ্যন্তরীণ অবস্থা যত সুন্নাত মোতাবেক হয় ততই আজর ও সওয়াব বেশী পাওয়া যায়। (বযলুল মাজহুদ)

হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি সময়মত 'নামাজ আদায় করে, উত্তমরূপে ওযূ করে, খুশু-খুযুর সাথে পড়ে, ধীর-স্থিরভাবে নামাজে দাঁড়ায়, রুকু-সেজদাও উত্তমরূপে শান্তভাবে করে, মোটকথা নামাজের সবকিছু উত্তমরূপে আদায় করে, তার নামাজ উজ্জ্বল ও নূরানী হয়ে উপরে যায় এবং নামাজীকে দোয়া দেয় যে, আল্লাহ তায়ালা তোমার এরূপ হেফাজত করুন, যেরূপ তুমি আমার হেফাজত করেছ। অপরদিকে, যে ব্যক্তি মন্দভাবে নামাজ আদায় করে, সময়ের দিকে লক্ষ্য রাখে না, ওযূও ভালরূপে করে না, রুকু-সেজদাও ঠিকমত করে না, তার নামাজ বিশ্রী ও কালো হয়ে বদ-দোয়া দিতে দিতে যায় যে, আল্লাহ তায়ালা তোমাকেও এরূপ ধ্বংস করুন, যেরূপ তুমি আমাকে ধ্বংস করেছ। অতঃপর সেই নামাজকে পুরানো কাপড়ের মত পেঁচিয়ে নামাজীর মুখের উপর মেরে দেওয়া হয় । (তারগীবঃ তাবারানী)

হযরত আবু মূসা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি দুই ঠাণ্ডার সময়ের নামাজ আদায় করে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (বোখারী)

ব্যাখ্যা : দুই ঠাণ্ডার সময়ের নামাজ বলতে ফজর ও আসরের নামাজ বুঝানো হয়েছে। ফজর ঠাণ্ডার সময়ের শেষের দিকে ও আসর ঠাণ্ডার সময়ের শুরুতে আদায় করা হয়। এই দুই নামাজকে বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হল, ফজরের নামাজ নিদ্রার আধিক্যের কারণে এবং আসরের নামাজ কাজ-কারবারে ব্যস্ততার দরুন আদায় করা কঠিন হয়ে যায়। অতএব যে ব্যক্তি এই দুই নামাজের পাবন্দী করবে সে অবশ্যই বাকি তিন নামাজেরও পাবন্দী করবে। (মেরকাত)

হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু  হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বেহেশতের চাবি হল নামাজ, আর নামাজের চাবি হল অযু। (মুসনাদে আহমাদ)

হযরত আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যারা অন্ধকারে মসজিদের দিকে যায় কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে (চারিদিক) আলোকিত করে এমন নূর দ্বারা নূরান্বিত করবেন। (তাবারানী, মাজমায়ে যাওয়ায়েদ)

হযরত আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন এখলাসের সাথে তকবীরে উলার সঙ্গে জামাতে নামাজ পড়ে সে দুইটি পরওয়ানা লাভ করে। এক পরওয়ানা জাহান্নাম হতে মুক্তির, দ্বিতীয় নেফাক (মুনাফেকী) হতে মুক্তির। (তিরমিযী)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আমানতদার নয় সে কামেল ঈমানদার নয়। যার অযূ নাই তার নামাজ আদায় হয় নাই। আর যে ব্যক্তি নামাজ পড়ে না তার কোন দ্বীন নাই। দ্বীনের মধ্যে নামাজের মর্যাদা এমন যেমন শরীরের মধ্যে মাথার মর্যাদা। অর্থাৎ মাথা ব্যতীত যেমন মানুষ জীবিত থাকতে পারে না তদ্রুপ নামাজ ব্যতীত দ্বীন বাকি থাকতে পারে না। (তাবারানী, তারগীব)

ফজরের নামাজ কয় রাকাত

ফজরের নামাজ চার রাকাত। প্রথমে দুই রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা যা অবশ্যই পড়তে হবে, নাহয় গুনা হবে। তারপর দুই রাকাত ফরজ। অর্থাৎ দুই রাকাত সুন্নাত এবং দুই রাকাত ফরজ। সর্বমোট চার রাকাত।

ফজরের নামাজের নিয়ত

নামাজের নিয়ত আরবিতে করতে হবে এরোকমটা না। নিয়ত আরবিতে বা বাংলাতে করা যায়। নিয়ত অর্থ এরাদা করা বা সংকল্প করা। নিয়তটা এভাবে হবে “আমি কেবলামুখী হয়ে দুই রাকাত ফজরের সুন্নাত/ফরজ নামাজ আদায় করতেছি”। 

ফজরের নামাজ কিভাবে পড়তে হয়

১। প্রথমে নিয়ত করা যে,“আমি কেবলামুখী হয়ে দুই রাকাত ফজরের সুন্নাত/ ফরজ নামাজ আদায় করতেছি” আল্লাহু আকবার হলে হাত বাধতে হবে।

২।  এবার ছানা পড়তে হবে (সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়া তাআলা জাদ্দুকা ওয়া লা-ইলাহা গাইরুক)।

৩। তারপর আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতনির রাজিম ও বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পড়ে সূরা ফাতিহা পড়তে হবে।

৪। সূরা ফাতিহা শেষ করার পর যেকোন একটি সূরা পাঠ করবেন।

৫। তারপর আল্লাহু আকবার বলে রুকু করতে হবে এবং রুকু হতে উঠার সময় পড়বেন “সামি আল্লাহু লিমান হামিদাহ্” এবং সোজা হয়ে দাড়িয়ে পড়বেন “রব্বানা লাকাল হামদ”। 

৬। তারপর সেজদা করতে হবে এবং সেজদার তাসবি পড়বেন তিন, পাঁচ অথবা সাতবার।

৭। দু্ই সেজদা শেষ করে আল্লাহু আকবার বলে দাড়িয়ে যেতে হবে। এভাবে প্রথম রাকাত শেষ হবে।

৮। এবার দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ফাতিহা পড়বেন এবং তার সাথে আরেকটি সূরা পড়বেন এবং আগের নেয় রুকু এবং দুই সেজদা করে বসতে হবে।

৯। বসে তাশাহুদ, দুরুদ এবং দোয়া মাসুরা পড়তে হবে। তারপর দুইদিকে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করবেন। 

একই নিয়মে ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত ও ফরজ আদায় করতে হবে।

ফজরের নামাজের ওয়াক্ত কখন শুরু হয়

ফজরের নামাজের ওয়াক্ত সুবহে সাদিকের পর থেকে শুরু হয়, অর্থাৎ পূর্ব আকাশে অন্ধকার কেটেগিয়ে যখন কিছুটা ফর্সা হয়ে উঠে, তখন থেকে ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়। আরেকটু সহজভাবে বলা যায় যে, সেহেরির সময় যখন শেষ হয়ে যায় তখন ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়। আর সূর্য উঠার আগ পর্যন্ত ফজরের ওয়াক্ত থাকে। সূর্য উঠার পরে পড়লে কাজা পড়তে হবে।

ফজরের নামাজ কয়টা পর্যন্ত পড়া যায়

ফজরের নামাজ সূর্য উঠার আগ পর্যন্ত পড়া যায়। তার পরে পড়লে কাজা পড়তে হবে। তবে কোন কারণে যদি ঘুম না ভাঙ্গে এবং ঘুম থেকে উঠার পরে দেখাগেল সূর্য উঠে গেছে বা ওয়াক্ত শেষ হয়েগেছে, তখন সাথে সাথে ওজু করে নামাজ আদায় করা যাবে। তবে এটি কাজা হিসেবে পড়তে হবে। সূর্য মাথার উপর আসার আগে আগে ফজরের কাজা আদায় করেনেয়া উত্তম।

আরও পড়ুন: তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম

পরবর্তী পোস্ট পূর্ববর্তী পোস্ট
মন্তব্য নেই
মন্তব্য যোগ করুন
comment url