বিতর নামাজ পড়ার নিয়ম বা বেতের নামাজের নিয়ম

বিতর নামাজ পড়ার নিয়ম


বিতর শব্দটি আরবি “আল-বিতরু” শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ বিজোড়। এই নামাজকে বিতর বলার কারণ হলো এই নামাজ বিজোড়। বিতর নামাজ তিন রাকাত হওয়ার কারণে বিতর নামে পরিচিতি পেয়েছে। তবে কারো কারো মতে বিতর নামাজ এক রাকাত। যেহেতু এক সংখ্যাটিও বিজোড়, তাই অনেকে বিতর নামাজকে এক রাকাত বলে থাকেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, “রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতরের নামাজ তিন রাকাত আদায় করতেন” (সুনান দারু কুতনি- ১৬৫৯)। এই নামাজ একা একা পড়তে হয়, তবে রমজান মাসে তারাবিহ নামাজ পড়ার পর জামাতবদ্ধভাবে ইমামের সাথে বিতর নামাজ পড়া হয়ে থাকে।

বিতর নামাজের নিয়ত

বিতর নামাজের নিয়ত অন্যান্য নামাজের নিয়তের মতই। বিতর বা বেতর নামাজের নিয়তে ওয়াজিব শব্দটি ব্যবহার করতে হয়। মুখে উচ্চারণ করে বলবেন বা মনে মনে এই নিয়ত করবেন যে, “আমি কেবলামুখী হয়ে তিন রাকাত বিতর এর ওয়াজিব নামাজ আদায় করতেছি ” এতটু বললে আল্লাহু আকবার বলে নিয়ত বাধবেন। নিয়ত আরবিতে বলা জরুরী নয়। কারণ নিয়ত মানে হলো এরাদা করা বা সংকল্প করা। তাই মুখে উচ্চরণ করে পড়া জরুরী নয়। বিতর নামাজ পড়ার জন্য দাড়িয়েছেন এটাই প্রকৃত নিয়ত।

বিতর নামাজ পড়ার নিয়ম বা বেতের নামাজের নিয়ম

১) পবিত্র স্থানে দাড়িয়ে কেবলামুখী হয়ে উপরে উল্লেখিত নিয়মে নিয়ত করা।

২) তারপর দুই হাত কানের লতি বরাবর উঠাতে হবে (মেয়েরা কাঁধ বরাবর হাত উঠাবে)। ছেলেরা আল্লাহু আকবার বলে নাভির নিচে বাম হাতের উপর ডান হাত রেখে, ডান হাতের বৃদ্ধা ও কনিষ্ঠা আঙ্গুল দিয়ে বাম হাতের কবজি ধরে নিয়ত বাধবে এবং মেয়েরা বুকের উপর বাম হাতের উপর ডান হাত বিছিয়ে হাত বাধবে। ।

৩) এবার ছানা পড়তে হবে।

আরবিতে ছানা: 

আরবিতে ছানা

ছানা বাংলাতে উচ্চারণ

সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়া তাআলা জাদ্দুকা ওয়া লা-ইলাহা গাইরুক। 

ছানার বাংলা অর্থ

হে আল্লাহ! তুমি পাক-পবিত্র, তোমার জন্য সমস্ত প্রশংসা, তোমার নাম বরকতময়, তোমার গৌরব অতি উচ্চ, তুমি ভিন্ন অন্য কেহ উপাস্য নাই।


৪) তারপর আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতনির রাজিম ও বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পড়ে সূরা ফাতিহা পড়তে হবে।

৫) সূরা ফাতিহা শেষ করার পর যেকোন একটি সূরা বা কোরআন শরীফের যেকোন স্থান হতে কম পক্ষে তিন আয়াত পড়তে হবে।

৬) এবার আল্লাহু আকবার বলে রুকু করতে হবে। রুকুতে যেয়ে রুকুর তাসবি পড়বেন, তিন বার, পাঁচবার, সাতবার যতবার ইচ্ছে। তবে বেজোড় সংখ্যা পড়লে উত্তম। সংখ্যা নির্ধারণ করে পড়লে নামাজে মনোযোগ ধরে রাখা যায়।

রুকুর তাসহিব আরবিতে 

রুকুর তাসবিহ আরবিতে

রুকুর তাসবির বাংলা উচ্চারণ:  সুবহানা রব্বিয়াল আযিম

রুকুর তাসবিহ এর বাংলা অর্থ

আমার মহান প্রতিপালকের পবিত্রতা বর্ণনা করতেছি।

৭) রুকু হতে উঠার সময় পড়তে হবে

সামি আল্লাহু লিমান হামিদাহ্




উচ্চারণ: সামি আল্লাহু লিমান হামিদাহ্

অর্থ: যে আল্লাহর প্রশংসা করেছে, আল্লাহ তার প্রশংসা কবুল করেছেন।

সোজা হয়ে দাড়িয়ে পড়তে হবে

রব্বানা লাকাল হামদ




উচ্চারণ: রব্বানা লাকাল হামদ।

অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক সকল প্রশংসা তোমারই।

৮) দাড়ানো থেকে আল্লাহু আকবার বলে সেজদায় যেতে হবে এবং সেজদার তাসবি পড়বেন তিন, পাঁচ অথবা সাতবার।

সেজদার তাসহিব আরবিতে

সুবহানা রাব্বিয়াল আ-লা




সেজদার তাসবির বাংলা উচ্চারণ: সুবহানা রাব্বিয়াল আ-লা

সেজদার তাসবিহ এর বাংলা অর্থ

আমার মহান প্রতিপালকের পবিত্রতা বর্ণনা করতেছে।


৯) এক সিজদা দেয়ার পর সোজা হয়ে বসে আবার দ্বিতীয় সিজদায় যেতে হবে। দুই সেজদার মাঝে সোজা হয়ে বসা ওয়াজিব এবং এক তাসবিহ পড়িমান সময় সোজা হয়ে অপেক্ষা করতে হবে। এক তাসবিহ হলো আল্লাহু আকবার বলতে যতটুকু সময় লাগে তাকে এক তাসবিহ পরিমান সময় বলে। এই পরিমান সময় দুই সেজদার মাঝে অপেক্ষা না করে দ্বিতীয় সেজদায় চলেগেলে ওয়াজি বাদ পরে যাবে এবং সাহু সেজদা না দিলে নামাজ হবে না। এবার দ্বিতীয় সেজদায় যেয়ে তিন, পাঁচ অথবা সাতবার “সুবহানা রাব্বিয়াল আ-লা” পড়বেন।

১০) এবার আল্লাহু আকবার বলে দাড়িয়ে যাবেন। এভাবে প্রথম রাকাত শেষ হবে। 

১১) এবার দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ফাতিহা পড়বেন এবং তার সাথে আরেকটি সূরা পড়বেন এবং আগের নেয় রুকু এবং দুই সেজদা করে বসে তাশাহুদ পড়তে হবে।

তাশাহুদ আরবিতে:

তাশাহুদ আরবিতে


তাশাহুদের বাংলা উচ্চারণ

আত্তাহিয়াতু লিল্লাহি ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াত তায়্যিবাত। আসসালামুয়ালাইকা আয়্যুহান নাবিয়্যু ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ্। আসসালামুয়ালাইনা আ'লা ইবাদিল্লাহিস সয়ালিহিন, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রসূলুহ্”।

তাশাহুদের বাংলা অর্থ

সমস্ত মৌখিক ইবাদত, সমস্ত শারীরিক ইবাদত এবং সমস্ত পবিত্র বিষয় আল্লাহ তা’আলার জন্য। হে নবী! আপসার উপর শান্তি ও তার বরকতসমূহ নাজিল হওক। আমাদের প্রতি ও আল্লাহ তা’আলার নেক বান্দাদের প্রতি তার শান্তি বর্ষিত হওক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত আর কোন মা’বুদ নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বান্দা ও রাসূল।


১২) তাশাহুদ শেষ করে আল্লাহু আকবার বলে দাড়িয়ে যাবেন।

১৩) এখন তৃতীয় রাকাতে দাড়িয়ে সূরা ফাতিহা পড়তে হবে এবং তার সাথে আরেকটি সূরা পড়তে হবে এবং দাড়ানো অবস্থাতেই হাত ছেড়ে দিতে হবে। আবার আল্লাহু আকবার বলে হাত কানের লতি বরাবর উঠাতে হবে (মেয়েরা কাঁধ বরাবর উঠাবে) এবং নাভির নিচে (মেয়েরা বুকের উপর) হাত বাধবে এবং বাম হাতের উপর ডান হাত বাধতে হবে।

১৪) এবার এই দাড়ানো অবস্থাতেই দোয়া কুনুত পড়তে হবে।

দোয়া কুনুত আরবিতে:

বিতর নামাজে দোয়া কুনুত


বিতর নামাজে দোয়া কুনুত বাংলা

আল্লাহুম্মা ইন্না নাস্তায়ীনুকা, ওয়া নাস্তাগফিরুকা, ওয়া নু'মিনু বিকা, ওয়া নাতাওয়াক্কালু 'আলাইকা, ওয়া নুছনী আলাইকাল খাইর। ওয়া নাশ কুরুকা, অলা- নাকফুরুকা, ওয়া নাখলাউ, ওয়া নাতরুকু মাঁই ইয়াফজুরুকা, আল্লাহুম্মা ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া লাকানুসল্লী, ওয়া নাসজুদু, ওয়া ইলাইকা নাস'আ, ওয়া নাহফিদু, ওয়া নারজু রাহমাতাকা, ওয়া নাখশা আযাবাকা, ইন্না আযাবাকা বিল কুফ্ফারি মুলহিক।

দোয়া কুনুতের বাংলা অর্থ

হে আল্লাহ! আমরা তোমারই সাহায্য চাই। তোমারই নিকট ক্ষমা চাই, তোমারই প্রতি ঈমান রাখি, তোমার ওপর ভরসা করি এবং সকল মঙ্গল তোমারই দিকে ন্যস্ত করি। আমরা তোমার কৃতজ্ঞ হয়ে চলি, অকৃতজ্ঞ হ‍ই না। হে আল্লাহ! আমরা তোমার দাসত্ব করি, তোমারই জন্য নামাজ পড়ি এবং তোমাকেই সিজদাহ করি। আমরা তোমার দিকে দৌড়াই ও এগিয়ে চলি। আমরা তোমার রহমতের আশা করি এবং তোমার আযাবকে ভয় করি। আর তোমার আযাবতো কাফেরদের জন্যই নির্ধারিত।


১৫) দোয়া কুনুত শেষ করে আল্লাহু আকবার বলে রুকুতে যেতে হবে এবং রুকুর তাসবি পড়তে হবে। রুকু থেকে উঠে সেজদায় যেতে হবে।

১৬) তারপর তাশাহুদ, দুরুদ ও দোয়া মাসুরা পড়তে হবে এবং সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করতে হবে। 

দুরূদ শরীফ আরবিতে:

দুরূদ শরীফ আরবিতে


দুরূদ শরীফ বাংলা উচ্চারণ

আল্লাহুম্মা সল্লিয়ালা মুহাম্মাদিও ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা সল্লাইতা আলা ইব্রাহীমা ওয়ালা আলি ইব্রাহীম, ইন্নাকা হামিদুম্মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিও ওয়ালা আলি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা আলা ইব্রাহীমা ওয়ালা আলি ইব্রাহীম, ইন্নিকা হামিদুম্মাজিদ।

দুরূদ শরীফের বাংলা অর্থ

হে আল্লাহ! তুমি রহমত বর্ষণ কর হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ও তাঁর পরিবারের পরিজনের প্রতি, যেমন রহমত বর্ষণ করেছিলে ইব্রাহীম (আ.) এর প্রতি ও তাঁর পরিবার পরিজনে প্রতি। নিশ্চয় তুমি প্রশংসিত ও সম্মানিত। হে আল্লাহ! তুমি বরকত নাজিল কর হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ও তাঁর পরিবার পরিজনের প্রতি, যেমন বরকত নাজিল করেছিলে ইব্রাহীম (আ.) এর প্রতি ও তাঁর পরিবার পরিজনের প্রতি। নিশ্চয় তুমি প্রসংসিত ও সম্মানিত।

দোয় মাছুরা আরবিতে:

দোয়া মাছুরা আরবিতে


দোয়া মাছুরা বাংলা উচ্চারণ

আল্লাহুম্মা ইন্নি জলামতু নাফসি জুলমান কাসিরা, ওয়ালা ইয়াগফিরুজ্ জুনুবা, ইল্লা আংতা, ফাগফিরলী মাগফিরাতাম, মিন ইংদিকা ওয়ার হামনী, ইন্নাকা আংতাল গাফুরুর রাহীম।

দোয়া মাছুরা বাংলা অর্থ

হে আল্লাহ! আমি আমার আত্মার উপর অসংখ্য জুলুম করেছি এবং তুমি ব্যতীত পাপসমূহ ক্ষমা করার আর কেহ নাই। অতএব আমাকে ক্ষমা কর তোমার নিজের পক্ষ হতে এবং আমাকে দয়া কর। নিশ্চয় তুমি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।

বিতর নামাজ দুই রাকাত পড়ে সালাম না ফেরানোর হাদিস

সাদ ইবনে হিশাম (রহ.) বর্ণনা করেন, আয়েশা রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহুমা তাকে বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতরের দুই রাকাতে সালাম ফেরাতেন না। (নাসায়ি১/২৪৮) এই হাদিসটিকে ইমাম হাকেম (রহ.) সহীহ বলেছেন।

হযরত খারেজাহ ইবনে হোযাফা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট আসলেন এবং বললেন যে, আল্লাহ তায়ালা আরেকটি নামাজ তোমাদেরকে দান করেছেন, যা তোমাদের জন্য লালবর্ণের উটের পাল হতে উত্তম। আর তা হল বেতরের নামাজ। আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য উহা আদায়ের সময় এশার নামাজের পর হতে ফজর পর্যন্ত নির্ধারণ করেছেন। (আবু দাউদ)

ব্যাখ্যা : আরবদের কাছে লালবর্ণের উট অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ মনে করা হত।

হযরত আবু দারদা রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, আমাকে আমার হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন বিষয়ের অসীয়ত করেছেন, এক. প্রত্যেক মাসে তিন দিন রোযা রাখা, দুই. শুইবার আগে বেতর পড়ে লওয়া তিন. ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত আদায় করা। (তাবারানী, মাজঃ যাওয়ায়েদ )

ব্যাখ্যা : যাদের রাতে উঠার অভ্যাস আছে তাদের জন্য (রাতে তাহাজ্জুদের সময়) উঠে বেতর পড়া উত্তম। আর যদি রাতে উঠার অভ্যাস না থাকে তবে ঘুমাবার পূর্বেই বেতর পড়ে লওয়া উচিত।

হযরত আলী রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, হে কুরআনওয়ালাগণ, অর্থাৎ হে মুসলমানগণ, তোমরা বিতর নামাজ পড়িও কারণ আল্লাহ তায়ালা বিতর অর্থাৎ বেজোড়। অতএব তিনি বিতর পড়াকে পছন্দ করেন। (আবু দাউদ)

ব্যাখ্যা : বিতর বেজোড় সংখ্যাকে বলা হয়। আল্লাহ তায়ালা বিতর হওয়ার অর্থ হইল, তাঁহার সমকক্ষ কেহ নাই। বিতর পড়াকে পছন্দ করার কারণও ইহাই যে, এই নামাযের রাকাত বেজোড়। (মাজমায়ে বিহারিল আনওয়ার)

মাসয়ালা

তৃতীয় রাকাতে দোয়া কুনুত না পড়ে সেজদায় চলেগেলে শেষ বৈঠকে সাহু সেজদা দিলে নামাজ সহীহ হয়ে যাবে।

আরও পড়ুন: সালাতুত তাসবিহ নামাজ পড়ার নিয়ম

পরবর্তী পোস্ট পূর্ববর্তী পোস্ট
মন্তব্য নেই
মন্তব্য যোগ করুন
comment url