জরুরি পারিবারিক প্রয়োজন, ছোট ব্যবসা, কৃষিকাজ, গবাদিপশু পালন কিংবা আয় বাড়ানোর উদ্যোগে অর্থের প্রয়োজন হলে অনেকেই এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার কথা বিবেচনা করেন। তবে ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু কত টাকা পাওয়া যাবে তার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা, ঋণের শর্ত, সার্ভিস চার্জ, মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ, কিস্তির সময়সূচি এবং নিজের পরিশোধক্ষমতা আগে যাচাই করা জরুরি।
বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের জন্য মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটি আইন, ২০০৬ রয়েছে। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটি বা এমআরএ সনদপ্রাপ্ত এবং সনদ বাতিল হওয়া ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের তথ্য প্রকাশ করে। তাই শুধু কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি বা মাঠকর্মীর কথার ওপর নির্ভর না করে প্রতিষ্ঠানটির সনদ, ঋণের লিখিত শর্ত, প্রযোজ্য সার্ভিস চার্জ এবং মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
ঋণ বিবেচনার একটি ব্যবহারিক উপায় হলো শুধু সম্ভাব্য ঋণের অঙ্ক না দেখে আগে নিজের কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা হিসাব করা। অর্থাৎ, “আমি কত টাকা ঋণ পেতে পারি?” প্রশ্নটির পাশাপাশি “নিয়মিত আয় ও প্রয়োজনীয় খরচ বজায় রেখে কত টাকা কিস্তি দেওয়া সম্ভব?” সেটিও বিবেচনা করা দরকার। এতে নিজের আর্থিক অবস্থার সঙ্গে ঋণের কিস্তি মানানসই কি না বুঝতে সুবিধা হয়।
- তথ্য যাচাই নোট: এই লেখাটি সাধারণ তথ্য ও ঋণ নেওয়ার আগে যাচাইযোগ্য বিষয়গুলো বোঝানোর উদ্দেশ্যে তৈরি। ক্ষুদ্রঋণের নিয়ম, সার্ভিস চার্জ, ফি বা অন্যান্য শর্ত সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটির সর্বশেষ তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লিখিত ঋণশর্ত যাচাই করুন।
প্রথমে এনজিওটির এমআরএ সনদ যাচাই করুন
ঋণ নেওয়ার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা যাচাই করা। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটির ওয়েবসাইটে সনদপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করা হয়। এমআরএ তাদের ওয়েবসাইটে সনদপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করে। একই সঙ্গে সনদ বাতিল হওয়া প্রতিষ্ঠানের তথ্যও আলাদাভাবে পাওয়া যায়। তাই পরিচিত নাম, স্থানীয় জনপ্রিয়তা অথবা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কার্যক্রম চালানোর বিষয়টিকেই বৈধতার একমাত্র প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
আরও নির্দিষ্টভাবে যাচাই করতে এমআরএর এমএফআই ই-ভেরিফিকেশন ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠানের সনদ নম্বর ব্যবহার করা যায়। সেখানে সনদ নম্বর দিয়ে প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ঋণ নেওয়ার আগে শাখা অফিস থেকে প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ নাম ও সনদ নম্বর জেনে সরকারি তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা একটি ভালো অভ্যাস।
সার্ভিস চার্জ কীভাবে হিসাব করা হচ্ছে বুঝুন
এনজিও ঋণের ক্ষেত্রে শুধু মূল ঋণের পরিমাণ জানলে মোট খরচ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় না। সার্ভিস চার্জের হার এবং কোন পদ্ধতিতে সেটি হিসাব করা হচ্ছে, দুটিই জানা প্রয়োজন। এমআরএর প্রকাশিত নির্দেশনায় ক্ষুদ্রঋণের সার্ভিস চার্জের ক্ষেত্রে ক্রমহ্রাসমান স্থিতি পদ্ধতির উল্লেখ রয়েছে। হার ও নিয়ম সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে, তাই ঋণ নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বর্তমান লিখিত শর্ত এবং এমআরএর সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা উচিত।
শুধু সার্ভিস চার্জের হার শুনে নিজের মতো করে মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ হিসাব করা ঠিক নয়। ক্রমহ্রাসমান স্থিতি পদ্ধতিতে বকেয়া মূলধনের পরিবর্তনের সঙ্গে হিসাবও পরিবর্তিত হয়। তাই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে লিখিত কিস্তি সূচি সংগ্রহ করে মূল ঋণ, সার্ভিস চার্জ, কিস্তির সংখ্যা এবং মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ যাচাই করা বেশি নির্ভরযোগ্য।
কিস্তির পরিমাণ নয়, মোট পরিশোধযোগ্য টাকা দেখুন
অনেক ঋণগ্রহীতা প্রথমে জানতে চান প্রতি সপ্তাহে বা মাসে কত টাকা কিস্তি দিতে হবে। কিন্তু ছোট কিস্তি সবসময় কম খরচের ঋণ বোঝায় না। ঋণের মেয়াদ দীর্ঘ হলে ছোট কিস্তিও দীর্ঘ সময় ধরে দিতে হতে পারে। তাই ঋণের মূল পরিমাণ, মোট সার্ভিস চার্জ, কিস্তির সংখ্যা এবং সব কিস্তি শেষে মোট কত টাকা পরিশোধ হবে এই চারটি তথ্য পাশাপাশি লিখে দেখা উচিত।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো ঋণ থেকে হাতে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা পাওয়া যাবে এবং মেয়াদ শেষে মোট কত টাকা পরিশোধ করতে হবে, এই দুটি তথ্য পাশাপাশি দেখুন। পাশাপাশি কিস্তির সংখ্যা ও প্রযোজ্য অন্যান্য খরচও যাচাই করুন। কোনো হিসাব বা শর্ত বুঝতে সমস্যা হলে চুক্তিতে স্বাক্ষর করার আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছ থেকে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া ভালো।
গ্রেস পিরিয়ড এবং কিস্তি শুরু হওয়ার তারিখ জানুন
ঋণের টাকা পাওয়ার পর কিস্তি কবে থেকে শুরু হবে সেটি আগে থেকেই জানা জরুরি, বিশেষ করে অর্থটি ব্যবসা বা আয়মূলক কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকলে। প্রথম কিস্তির তারিখ, কিস্তির সংখ্যা, কিস্তির ব্যবধান এবং কোনো গ্রেস পিরিয়ড প্রযোজ্য কি না ঋণের লিখিত শর্তে যাচাই করুন। এসব নিয়ম ঋণের ধরন বা বর্তমান নির্দেশনা অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে, তাই প্রতিষ্ঠানের দেওয়া কিস্তি সূচির সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে নেওয়া উচিত।
নিজের পরিশোধক্ষমতা বাস্তবভাবে হিসাব করুন
ঋণ অনুমোদন পাওয়া এবং ঋণটি স্বাচ্ছন্দ্যে পরিশোধ করতে পারা এক বিষয় নয়। একজন ঋণগ্রহীতার নিজের আয়, নিয়মিত পারিবারিক ব্যয়, চিকিৎসা বা শিক্ষার খরচ, বিদ্যমান দেনা এবং জরুরি ব্যয়ের সম্ভাবনা বিবেচনা করে কিস্তির সক্ষমতা নির্ধারণ করা উচিত। বিশেষ করে অনিয়মিত আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে ভালো মাসের আয় ধরে কিস্তি নির্ধারণ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
একটি ব্যবহারিক পদ্ধতি হলো গত তিন থেকে ছয় মাসের আয় ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ের একটি সাধারণ হিসাব তৈরি করা। প্রয়োজনীয় পারিবারিক খরচ বাদ দেওয়ার পর নিয়মিত কত টাকা অবশিষ্ট থাকে তা দেখুন এবং সম্ভাব্য কিস্তি সেই অর্থের সঙ্গে তুলনা করুন। কিস্তি পরিশোধের জন্য নিয়মিতভাবে নতুন ধার নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে হলে ঋণের পরিমাণ বা ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
একাধিক ঋণ থাকলে নতুন ঋণের আগে হিসাব করুন
একটি ঋণের কিস্তি চালু থাকা অবস্থায় আরেকটি ঋণ নিলে মোট দায় দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে নতুন ঋণের একটি অংশ যদি আগের ঋণের কিস্তি পরিশোধে চলে যায়, তাহলে ঋণটি নতুন আয় তৈরির পরিবর্তে পুরোনো দায় স্থানান্তরের মাধ্যম হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই নতুন ঋণ নেওয়ার আগে বর্তমানে কত টাকা বকেয়া আছে, প্রতি সপ্তাহ বা মাসে মোট কত কিস্তি দিতে হচ্ছে এবং নতুন ঋণ যুক্ত হলে মোট দায় কত হবে তা লিখে হিসাব করা প্রয়োজন।
ঋণের টাকা কোথায় ব্যবহার করবেন আগে ঠিক করুন
ঋণ নেওয়ার আগে অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার করবেন তার একটি পরিষ্কার পরিকল্পনা তৈরি করা ভালো। ব্যবসার পণ্য, কৃষি উপকরণ, উৎপাদন সরঞ্জাম বা অন্য কোনো আয়মূলক কাজে ঋণ ব্যবহার করলে সম্ভাব্য আয় ও কিস্তির সময়সূচি পাশাপাশি হিসাব করুন। আর জরুরি পারিবারিক প্রয়োজনের জন্য ঋণ নিলে সেই কিস্তি কোন নিয়মিত আয়ের উৎস থেকে পরিশোধ করবেন, সেটিও আগে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ঋণের অঙ্ক নির্ধারণের সময় সর্বোচ্চ কত টাকা পাওয়া সম্ভব তার পরিবর্তে বাস্তবে কত টাকা প্রয়োজন এবং কত টাকা নিয়মিত পরিশোধ করা সম্ভব, সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া ভালো। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ঋণ নিলে মোট পরিশোধের দায়ও বাড়তে পারে।
ফরম, পাশবই ও অন্যান্য খরচ সম্পর্কে জানুন
মূল ঋণ ও সার্ভিস চার্জের বাইরে ভর্তি, পাশবই, ফরম বা অন্য কোনো খাতে অর্থ দিতে হবে কি না আগে জেনে নিন। কোনো অতিরিক্ত অর্থ চাওয়া হলে সেটি কোন খাতে নেওয়া হচ্ছে, বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী অনুমোদিত কি না এবং তার রসিদ দেওয়া হবে কি না যাচাই করুন। প্রয়োজনে এমআরএর সর্বশেষ গ্রাহক নির্দেশনার সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা যেতে পারে।
ঋণের অনুমোদিত অর্থ থেকে কোনো টাকা আগে কেটে রাখা হচ্ছে কি না সেটিও যাচাই করুন। কোনো অর্থ কাটা হলে সেটি কোন খাতে, কোন নিয়মে এবং চুক্তির কোথায় উল্লেখ রয়েছে তা লিখিতভাবে জানতে চান। হাতে পাওয়া প্রকৃত অর্থের পরিমাণও ঋণের কাগজের সঙ্গে মিলিয়ে রাখুন।
সব নথি ও লেনদেনের প্রমাণ সংরক্ষণ করুন
ঋণের আবেদনপত্র, চুক্তিপত্র, পাশবই, কিস্তির সূচি এবং প্রতিটি পরিশোধের রসিদ যত্ন করে রাখুন। নগদে কিস্তি দিলে পাশবইয়ে সঠিক অঙ্ক ও তারিখ লেখা হয়েছে কি না সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। কোনো ফাঁকা কাগজ বা অসম্পূর্ণ ফরমে স্বাক্ষর করা উচিত নয়। নিজের কাছে চুক্তির কপি রাখলে ভবিষ্যতে হিসাব নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিলে তথ্য যাচাই করা সহজ হয়।
সমস্যা হলে দ্রুত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করুন
আয় কমে যাওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ব্যবসায় ক্ষতি বা অন্য কোনো বাস্তব কারণে নির্ধারিত সময়ে কিস্তি দেওয়া কঠিন হলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট শাখা বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা ভালো। বিশেষ পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান আলাদা নির্দেশনা বা ব্যবস্থা দিতে পারে। তাই অনুমান না করে আপনার ঋণের ক্ষেত্রে বর্তমানে কোনো বিশেষ ব্যবস্থা প্রযোজ্য কি না লিখিতভাবে জানতে চান এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংরক্ষণ করুন।
এনজিও ঋণ নেওয়ার আগে নিজের জন্য একটি ছোট যাচাই তালিকা তৈরি করুন
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে কয়েকটি তথ্য আলাদাভাবে লিখে নিন: প্রতিষ্ঠানটি এমআরএ সনদপ্রাপ্ত কি না, হাতে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা পাবেন, মোট কত টাকা পরিশোধ করবেন, কয়টি কিস্তি দিতে হবে, প্রথম কিস্তির তারিখ কী, অতিরিক্ত কোনো ফি আছে কি না এবং বর্তমানে অন্য ঋণের কিস্তি রয়েছে কি না। এরপর এই তথ্যগুলো ঋণের লিখিত চুক্তি ও কিস্তি সূচির সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। কোনো শর্ত অস্পষ্ট থাকলে সেটি পরিষ্কারভাবে না বোঝা পর্যন্ত স্বাক্ষর না করাই ভালো।
এনজিও ঋণ সম্পর্কে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর
১. এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া কি নিরাপদ?
সনদপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রেও শর্ত ও খরচ ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানটির এমআরএ সনদ, লিখিত চুক্তি, সার্ভিস চার্জ, কিস্তির সূচি এবং মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ দেখে সিদ্ধান্ত নিন। একই সঙ্গে কিস্তি নিজের নিয়মিত আয় থেকে পরিচালনা করা সম্ভব কি না বিবেচনা করুন।
২. কোনো এনজিও বৈধ কি না কীভাবে বুঝব?
মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটির ওয়েবসাইটে সনদপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের তালিকা রয়েছে। এছাড়া এমএফআই ই-ভেরিফিকেশন ব্যবস্থায় সনদ নম্বর দিয়ে তথ্য যাচাই করা যায়। একই সঙ্গে সনদ বাতিল হওয়া প্রতিষ্ঠানের তালিকাও দেখা উচিত।
৩. এনজিও ঋণের সার্ভিস চার্জ কত?
সার্ভিস চার্জ ঋণের শর্ত ও প্রযোজ্য নিয়ন্ত্রক নির্দেশনার ভিত্তিতে যাচাই করা উচিত। ঋণ নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লিখিত কাগজে বর্তমান হার, হিসাবের পদ্ধতি এবং মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ দেখুন। প্রয়োজন হলে এমআরএর সর্বশেষ নির্দেশনার সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে নিন। শুধু মৌখিকভাবে জানানো হারের ওপর নির্ভর না করাই ভালো।
৪. কিস্তি সাপ্তাহিক নাকি মাসিক হওয়া ভালো?
এটি মূলত আপনার আয়ের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট ঋণের শর্তের ওপর নির্ভর করে। দৈনিক বা সাপ্তাহিক নগদ প্রবাহ থাকা ছোট ব্যবসায় সাপ্তাহিক কিস্তি পরিচালনা করা সহজ হতে পারে। অন্যদিকে মাসে একবার আয় হলে সাপ্তাহিক কিস্তি চাপ তৈরি করতে পারে। তাই নিজের আয়ের সময়ের সঙ্গে কিস্তির সময়সূচি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
৫. একসঙ্গে একাধিক এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া উচিত কি?
একাধিক ঋণ থাকলে মোট কিস্তির চাপ বেড়ে যায় এবং একটি ঋণের কিস্তি দিতে অন্য ঋণের প্রয়োজন তৈরি হতে পারে। নতুন ঋণ নেওয়ার আগে সব বর্তমান ঋণের বকেয়া ও কিস্তি একসঙ্গে হিসাব করুন। নতুন ঋণ যুক্ত হওয়ার পরও স্বাভাবিক পারিবারিক ব্যয় চালানো সম্ভব কি না সেটি বিবেচনা করা জরুরি।
৬. ঋণ নেওয়ার আগে কী কী কাগজ সংগ্রহ করা উচিত?
ঋণের আবেদন বা চুক্তির কপি, কিস্তির সূচি, পাশবই এবং অর্থ গ্রহণের প্রমাণ নিজের কাছে রাখা ভালো। পরবর্তী প্রতিটি কিস্তির রসিদও সংরক্ষণ করা উচিত। এতে কত টাকা দেওয়া হয়েছে এবং কত টাকা বাকি আছে তা সহজে যাচাই করা যায়।
৭. ঋণের টাকা হাতে পাওয়ার পর প্রথমে কী করা উচিত?
প্রথমে হাতে পাওয়া প্রকৃত অর্থ চুক্তিতে উল্লেখ করা অঙ্কের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। এরপর আগে তৈরি করা ব্যবহার পরিকল্পনা অনুযায়ী অর্থ ব্যয় করুন। ব্যবসা বা আয়মূলক কাজের জন্য ঋণ নিলে ব্যক্তিগত অপ্রয়োজনীয় খরচের সঙ্গে সেই অর্থ মিশিয়ে না ফেললে হিসাব রাখা সহজ হয়।
৮. কিস্তি দিতে সমস্যা হলে কী করা উচিত?
সমস্যা শুরু হলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জানান। নিজের আয় বা ব্যবসার বর্তমান পরিস্থিতি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করুন এবং আপনার ঋণের ক্ষেত্রে কোনো প্রযোজ্য ব্যবস্থা বা বিকল্প রয়েছে কি না লিখিতভাবে জানতে চান। পুরোনো কিস্তি পরিশোধের জন্য নতুন ঋণ নেওয়ার আগে মোট দায় ও নতুন কিস্তির প্রভাব ভালোভাবে হিসাব করা প্রয়োজন।
৯. ঋণের মোট খরচ কীভাবে বুঝব?
হাতে পাওয়া অর্থ এবং মেয়াদ শেষে মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ পাশাপাশি লিখুন। এরপর সার্ভিস চার্জ, অনুমোদিত ফি এবং অন্য কোনো প্রযোজ্য খরচ আলাদাভাবে দেখুন। প্রতিষ্ঠান থেকে পূর্ণ কিস্তি সূচি সংগ্রহ করলে কোন সময়ে কত টাকা দিতে হবে সেটিও পরিষ্কার হবে।
১০. ঋণ নেওয়ার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন কোনটি?
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো, “এই ঋণের কিস্তি কি আমি নিয়মিত আয় থেকে প্রয়োজনীয় পারিবারিক ব্যয় বজায় রেখেই দিতে পারব?” শুধু ঋণ অনুমোদন হবে কি না সেটি বিবেচনা না করে ঋণ নেওয়ার পর কিস্তি নিয়মিত পরিচালনা করা সম্ভব কি না হিসাব করুন। সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ থাকলে ঋণের অঙ্ক কমানো বা সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা যুক্তিসংগত।
উপসংহার
এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত ব্যক্তির প্রয়োজন, আয়, বর্তমান দায় এবং পরিশোধক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানের এমআরএ সনদ, লিখিত ঋণশর্ত, সার্ভিস চার্জ, মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ, কিস্তির সংখ্যা ও সময়সূচি এবং অতিরিক্ত খরচ যাচাই করুন।
একই সঙ্গে নিয়মিত পারিবারিক ব্যয় বজায় রেখে কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব কি না হিসাব করুন। কোনো শর্ত অস্পষ্ট হলে স্বাক্ষর করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং প্রয়োজন হলে এমআরএর হালনাগাদ তথ্য থেকে সেটি যাচাই করে নেওয়া উচিত।